ফাইজুর রহমান
উপ-নির্বাহী সম্পাদক, প্রত্যয় সংবাদ।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাচ্ছি ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ
উতসর্গকারী সকল বীর শহীদ ভাইদের প্রতি। আমরা ভাষার যথাযথ ব্যাবহার বলতে কি বুঝি?যেকোনো
ভাষার যথাযথ ব্যাবহার বলতে আমরা সে ভাষাকে দেশের শিক্ষাঙ্গন, সাহিত্য-সাংস্কৃতি
অঙ্গন, প্রসাশন, সমাজ তথা সকল স্থান-কাল-পাত্রে প্রমিত রুপে প্রাধান্য দেওয়াকেই
বুঝি।আর সুদীর্ঘ ইতিহাস হেতু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই প্রাধান্য দেওয়াই
যথেষ্ঠ নয় বরং একে সকল ক্ষেত্রে নিরংকুশভাবে প্রতিষ্ঠা করাই যথাযথ।আমাদের দেশের
শিক্ষাব্যাবস্থা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় পরিচালিতঃ সাধারণ শিক্ষাব্যাবস্থা, ইংলিশ
মিডিয়াম এবং মাদরাসাহ শিক্ষাব্যাবস্থা। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে, দেশের
তিনটি শিক্ষাব্যাবস্থার মধ্যে দুইটিই বিদেশি ভাষা নির্ভর।আর সাধারণ যে
শিক্ষাব্যাবস্থা আছে সেটি কোনভাবেই বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগে সহায়ক নয় বরং বাধা
সৃষ্টি করে। এর কারণ আমরা দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যাবস্থা থেকে শুরু করে উচ্চতর
শিক্ষাব্যাবস্থা পর্যন্ত ঠিক দেখতে পাবো। প্রাথমিকে একটি শিশুর কাছে বাংলা ব্যাকরণ বাস্তবিকই খুব ভিতীকর ও গুরুগম্ভির একটি বিষয়।
জাতীয় শিক্ষাক্রমের সনাতন, আনাধুনিক, জটিল, আনন্দহীন, একঘেয়ে এবং মুখস্থনির্ভর
পদ্ধতির ফলেই আজকে একটি শিশু বাংলার চাইতে ইংরেজী, অংক বা বিজ্ঞান পড়তে বেশি
সাচ্ছ্যন্দবোধ করে। বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগের জন্য বাংলা ভাষায় লেখাপড়ার ভিত্তি
স্থাপন করে অন্যান্য ভাষা দিয়ে সৌধ গড়া বাঞ্চনীয়। কিন্তু বর্তমানে সকল উউচ্চশিক্ষা
ইংরেজী ভাষায় হওয়ায় সমাজের অধিকাংশ অভিভাবকরাই শিশুদের ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায়
সাফল্যের নিমিত্তে তাদের ভাষা শিক্ষার ভিত্তি শুরু করে ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলে বা
মাদরাসায়। যার ফলে শিশু্রা মন থেকে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বা
দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে এবং ভিনদেশী ভাষার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়।মাধ্যমিক
শিক্ষার সিলেবাসে বাংলা ও ইংরেজী উভয় ভাষার মানবন্টন একই হলেও এটিকে একটি
অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। মাধ্যমিকের একজন ছাত্র বাংলাকে একটি
অনাকর্ষণীয়, অপ্রিয় এবং অহেতুক বিষয় বলে মনে করে। তারা বাংলাকে শুধু পরিক্ষায় পাশ
করার জন্যই অধ্যায়ন করে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে শিক্ষাব্যাবস্থায় বাংলাকে সময়ের সাথে
তাল হারানো ও প্রয়োগহীন বিষয় হিসাবে রাখা হয়েছে।আমরা যদি উচ্চ-মাধ্যমিকের দিকে
তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে এখানে ভাষার মূল্যায়ন হচ্ছে— বাড়িতে ইংরেজী যদি হোস্ট
অর্থাৎ আপনজন হয় আর আরবি বা অন্যান্য ভাষা যদি মেহমান হয় তাহলে বাংলা ভাষা হবে
বাড়ির পার্ট-টাইম কাজের লোকের মতো, যার বিস্তর যত অল্প রাখা যায় ততই ভালো। উচ্চ
মাধ্যমিকের একটি ছাত্র বিজ্ঞান, ইংরেজী বা অংকে যতটুকু গুরুত্ব দেয় তার সিকি ভাগও
বাংলায় দেয় না।আমাদের দেশের বিভিন্ন সরকারী বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময়ও
ইংরেজীর আধিপত্য বেশ লক্ষ্য করা যায় । একটি ছাত্র কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার কোন
অনুষদে চান্স পেলে তা বলতে লজ্জাবোধ করলেও ইংরেজী অনুষদে ভর্তির সুযোগ পেলে আনন্দে
আত্মোহারা হয়ে যায়।এটি খুবই দুখঃজনক যে ভাষা আন্দোলনের এতো বছর পরেও ডিগ্রীতে এখনো
ইংরেজী বই পড়ানো হয়। তথ্যবহুল ইংরেজী বা অন্যান্য ভাষার বই সমূহ বাংলায় অনুবাদ করা
হয়তোবা কোন কঠিন বিষয় ছিলো না। তবুও শিক্ষাব্যাবস্থার বেহাল দশার ফলে আজকে তা
সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চতর শ্রেণীতে ইংরেজী ভাষার আধিপত্য থাকার কারনে মানুষ এখন গোড়া
থেকেই ইংরেজী ভাষা চর্চা শুরু করছে, যা বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যাবহার নিশ্চিতে বড়
বাধা হয়ে দাড়িয়েছে।আজকে তুরস্ক, চীন বা জাপান তাদের নিজস্ব ভাষার যথাযথ ব্যাবহার
নিশ্চিত করতে পেরেছে শুধুমাত্র এই শিক্ষাব্যাবস্থাকে নিজেদের ভাষায় ঢেলে সাজানোর
ফলে।এই শিক্ষাব্যাবস্থার সমূহত্রুটির ফলেই আজকে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ
অশিক্ষিতই রয়ে যাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত হচ্ছে না।
যাই হোক, ২১শে ফব্রুয়ারীর এই দিনে আমাদের সকলকে বাঙ্গলা ভাষার প্রতি
শ্রদ্ধাশীল হয়ে জীবনের সকল স্তরে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে
হবে।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন