অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন
ভূমিকা:
তাকওয়া মু‘মিন জীবনের অপরিহার্য একটি বিষয়। আল-কুর’আনে আল্লাহ তায়ালা মু‘মিনকে তাকওয়ার গুনে গুণান্বিত হতে নির্দেশ করেছেন। তাদের গোটা জীবনকে তাকওয়ার পোষাকে আচ্ছাদন করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। রাসূল (স.) মু‘মিনদেরকে তাকওয়া সম্পন্ন হতে বিভিন্ন দোআও শিখিয়েছেন। তাকওয়া মু‘মিনের অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন একটি গুণ যা অর্জিত হলে মানুষ তার জীবনে অসংখ্য ভাল গুণের সমাহার ঘটাতে এবং অনেক অসৎ কর্ম থেকে বিরত থাকতে পারে। তাকওয়া একটি আধ্যাত্মিক শক্তি। প্রবন্ধে পাঠকদের উদ্দেশ্যে তাকওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কতিপয় দিক তুলে ধরা হলো।
তাকওয়ার التَّقْوَى পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ:
তাকওয়া শব্দটি পবিত্র কুর’আনে ৬ টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা:
الخوف والخشية :(ভয়-ভীতি )يا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ[سورة الحج (২২) : آية ১]
অর্থাৎ হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন অত্যন্ত ভয়াবহ। (সূরা আল হাজ্জ-১)
العبادة:(ইবাদত) يُنَزِّلُ الْمَلائِكَةَ بِالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلى مَنْ يَشاءُ مِنْ عِبادِهِ أَنْ أَنْذِرُوا أَنَّهُ لاَ إِلهَ إِلاَّ أَنَا فَاتَّقُونِ [سورة النحل (১৬) : آية ২]
অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি ইচ্ছা ফিরিস্তাগন জিবরীল আমীনের মাধ্যমে আল্লাহর হুকুমে তার উপর (কিতাব) অবতীর্ণ করেন। যেন তাদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয় যে, আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই । সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর। (সূরা আন নাহল -২)
ترك المعصية :(অবাধ্যতা পরিহার করা) وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوابِها وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [سورة البقرة (২) : آية ১৮৯] أي لا تعصوه.
অর্থাৎ তোমরা দরজা দিয়ে তোমাদের ঘরে প্রবেশ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর (অবাধ্যতা পরিহার কর) তবেই তোমরা সফলকাম হবে। (সূরা আল বাকারাহ -১৮৯)
التّوحيد(একত্ববাদ) أُولئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ [سورة الحجرات (৪৯) : آية ৩] أي للتّوحيد.
অর্থাৎ তারাই হচ্ছে সে সকল লোক যাদের অন্তরসমূহকে আল্লাহ একত্ববাদের জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন।(সূরা আল হুজুরাত -৩)
الإخلاص:(একনিষ্ঠতা) ذلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعائِرَ اللَّهِ فَإِنَّها مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ [سورة الحج (২২) : آية ৩২]
এটা এজন্য যে, যে ব্যাক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে সেটা তার অন্তরের একনিষ্ঠতার পরিচয়।(সূরা আল হাজ্জ-৫২)
الإخبات :(বিনয়ী হওয়া)وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنا مَنْسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعامِ فَإِلهُكُمْ إِلهٌ واحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ [سورة الحج (২২) : آية ৩৪]
অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর একটি নিয়ম ঠিক করে দিয়েছি, যাতে (সে উম্মতের) লোকেরা সে পশুদের ওপর আল্লাহর নাম নেয় যেগুলো তিনি তাদেরকে দিয়েছেন৷ (এ বিভিন্ন নিয়মের উদ্দেশ্য একই) কাজেই তোমাদের ইলাহও সে একজনই এবং তোমরা তাঁরই অনুগত হয়ে যাও৷ আর হে নবী! সুসংবাদ দিয়ে দাও বিনয়ের নীতি অবলম্বন কারীদেরকে। (সূরা-আল হাজ্জ-৩৪)
উল্লেখ্য যে, আল-কুর’আনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ২৩০ (দুইশত ত্রিশ) বারের অধিক তাকওয়া শব্দটি উল্লেখ করেছেন।
পারিভাষিক অর্থ:
قال ﻋﻠﻲ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﻃﺎﻟﺐ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺍﻟﺘﻘﻮﻯ ﻫﻲ ﺍﻟﺨﻮﻑ ﻣﻦ ﺍﻟﺠﻠﻴﻞ ، ﻭﺍﻟﻌﻤﻞ ﺑﺎﻟﺘﻨﺰﻳﻞ ، ﻭﺍﻟﻘﻨﺎﻋﺔ ﺑﺎﻟﻘﻠﻴﻞ ، ﻭﺍلاﺳﺘﻌﺪﺍﺩ ﻟﻴﻮﻡ ﺍﻟﺮﺣﻴﻞ
১। হযরত আলী (রা:) বলেছেন “তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা, আল কুর’আন অনুযায়ী আমল করা, অল্পতে তুষ্ট থাকা এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা”
ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺍﻟﺘﻘﻮﻯ ﺃﻥ ﻳﻄﺎﻉ ﻓﻼ ﻳﻌﺼﻲ ﻭﻳﺬﻛﺮ ﻓﻼ ﻳﻨﺴﻰ ﻭﺃﻥ ﻳﺸﻜﺮ ﻓﻼ ﻳﻜﻔﺮ.
২। আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা:) বলেছেনÑ “তাকওয়া হচ্ছে অবাধ্যতা নয় আনুগত্য, ভুলে যাওয়া নয় স্মরণ রাখা এবং কুফরী নয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা”
ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻤﺮ ﺑﻦ ﻋﺒﺪﺍﻟﻌﺰﻳﺰ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ : ﺗﻘﻮﻯ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﺮﻙ ﻣﺎ ﺣﺮﻡ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺃﺩﺍﺀ ﻣﺎ ﺍﻓﺘﺮﺽ ﺍﻟﻠﻪ
৩। ওমর ইব্ন আব্দুল আযীয (র:) বলেছেনÑ“তাকওয়া হচ্ছেÑআল্লাহ যা হারাম করেছেন তা বর্জন করা, তিনি যা ফরজ করেছেন তা আদায় করা”
সুতরাং উপরোক্ত তিনটি সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে এক কথায় বলা যায়:
التَّقْوَى اجتِمَاعُ الْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ الْحَسَنَةِ مَعَ اتِّقَاءِ الْأَعْمَالِ الْفَاسِدَةِ السَّيِّئَة
৪। তাকওয়া হলো উত্তম ও সৎকর্মের সমন্বয় করা সাথে সাথে খারাপ ও মন্দ কাজ বর্জন করা।
অর্থাৎ তাকওয়া হলো আল্লাহর জন্য একজন মুসলিম যে ভয় এবং ভালাবাসা অনুভব করে, একজন তাকওয়াবান ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিতে থাকতে আকাঙ্খা করে এবং সে বিরত থাকতে চায় সে সব বিষয় থেকে যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধি-নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে সে সতর্ক থাকে।
মুত্তাকীর বৈশিষ্ট্য
وصدق في اللّسان وشكر على النّعماء وصبر على البلاء ومن رضي بالقضاء ووفّى بالوعد والعهد، وتلا لأحكام القرآن
অর্থাৎ একজন মুত্তাকীর বৈশিষ্ট হলো: সে সর্বদা সত্য কথা বলবে, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করবে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে এবং তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকবে, ওয়াদা পরিপূর্ণ করবে এবং আল কুর’আনের বিধি-নিষেধ জানবে।
ঘ. মুত্তাকীর পরিচয়
ﻭﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ : ﺍﻟﻤﺘﻘﻮﻥ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﻳﺤﺬﺭﻭﻥ ﻣﻦ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻘﻮﺑﺘﻪ ﻓﻲ ﺗﺮﻙ ﻣﺎ ﻳﻌﺮﻓﻮﻥ ﻣﻦ ﺍﻟﻬﺪﻱ ﻭﻳﺮﺟﻮﻥ ﺭﺣﻤﺘﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﺘﺼﺪﻳﻖ ﺑﻤﺎ ﺟﺎﺀ ﺑﻪ
আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা:) বলেছেন: “মুত্তাকী তারাই যারা ভাল কাজ পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে আল্লাহর আযাবের বিষয়ে সতর্ক থাকে, আর আল্লাহ যে বিধি-বিধান দিয়েছেন তা মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে তার রহমতের আশা করে”
ﻭﻗﺎﻝ ﺍﻟﺤﺴﻦ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ: ﺍﻟﻤﺘﻘﻮﻥ ﺍﺗﻘﻮﺍ ﻣﺎ ﺣﺮﻡ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﻭﺃﺩﻭﺍ ﻣﺎ ﺍﻗﺘﺮﺽ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻬﻢ
হাসান বসরী (র:) বলেছেন “মুত্তাকী তারাই, যারা আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে এবং আল্লাহ তাদের উপর যা ফরজ করেছেন তা আদায় করে”
وَذَرُوا ظاهِرَ الْإِثْمِ وَباطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِما كانُوا يَقْتَرِفُونَ[سورة الأنعام (৬) : آية ১২০ ]
অর্থাৎ তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাক৷ যারা গুনাহে লিপ্ত হয়, তাদেরকে নিজেদের সব কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করতেই হবে৷ (সূরা আল আনআম-১২০)
التقي الذي ترك ظاهر الإثم وباطنه
সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত থেকে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, মুত্তাকী হলো ঐ ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন।
তাকওয়ার র্শায়ী মর্যাদা
ইসলামী শরিয়তে তাকওয়াকে ملاك الدين বা দ্বীনের মূল বলা হয়েছে। নিয়ত ও এখলাসের মূল ভিত্তি তাকওয়া। তাকওয়া ব্যতীত আল্লাহর নিকট কোন কিছুরই মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশ পরিচয় কোন কিছুকেই মার্যাদার মাপকাঠী হিসেবে দেখা হয়নি; বরং তাকওয়াকে মর্যাদার মানদন্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
يا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْناكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثى وَجَعَلْناكُمْ شُعُوباً وَقَبائِلَ لِتَعارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ [سورة الحجرات (৪৯) : آية ১৩]
অর্থাৎ হে মানব সমাজ! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভাজন করেছি যেন তোমরা নিজেদের পরিচয় বহন করতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম যে অধিক তাকওয়াবান। (সূরা আল-হুজুরাত-১৩)। চলবে........................


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন