লেখকঃ গোলাম মাওলা রনি
সাবেক সাংসদ ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট
আজকের লেখাটি শুরু করব ঠিক এমন সময়ে আমার এক ভগ্নিপতি ফোন দিলেন। দুলাভাইয়ের বয়স প্রায় ৭৫ বছর। বহু বছর দেশের কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করার পর তিনি বুড়ো বয়সে আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন অবসর সময় কাটানোর জন্য। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে সুনাম থাকার কারণে দেশের একটি শীর্ষ সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। সারা জীবন সোজাপথে চলা বুড়ো মানুষটি বর্তমান জমানার ডিজিটাল ভূতদের সঙ্গে কিছুতেই পেরে ওঠেননি। ফলে একরাশ বেদনা এবং অনেক অমীমাংসিত অভিযোগের দায় মাথায় নিয়ে স্বেচ্ছায় সরে গিয়েছিলেন। তিনি এখন কার্যত বেকার – সারাদিন পত্রপত্রিকা ও দেশি-বিদেশি টিভির খবর দেখেন এবং নীরবে-নিভৃতে সরকার ও সরকারপ্রধানের জন্য উৎকণ্ঠিত থেকে সময় অতিবাহিত করেন।
দুলাভাই হঠাৎ টেলিফোন করে বললেন – রনি তাড়াতাড়ি টিভি খোলো। প্রধানমন্ত্রী কি একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছেন! তিনি আবেগজড়িত হয়ে কেবল চোখের জল ফেলছেন কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। আমি তো আগা-মাথা কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি একটু দেখো এবং কিছু বুঝতে পারো কি না তা জানাও। আমি তাকে বললাম – ভাইয়া আমি তো অফিসে। এখানে ডিশ নেই। তিনি খানিকটা বেদনাহত হয়ে ফোন রেখে দিলেন। দুলাভাইয়ের কথা শোনার পর আমার মনে হলো আজকের শিরোনামে বিস্তারিত লেখার আগে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে কিছু লেখা দরকার।
পুরো দেশ আজ এক জীবন্ত নরককু-লীতে পরিণত হয়েছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষ আজ বিভ্রান্ত, ভীতসন্ত্রস্ত এবং বিক্ষুব্ধ। সরকার সমর্থকরা সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধীদের নির্মূলের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের বারোটা বাজানোর জন্য বিরোধীরা সাধ্যমতো সবকিছু করছে। মাঝখানে জনগণ পিষ্ট হয়ে দৈনিক আড়াই হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন কোনো দলকেই সমর্থন করছে না – বরং উভয় দলকেই ঘৃণা করছে। এমনকি দুই দলের কট্টর সমর্থকরাও চাচ্ছে দেশে শান্তি ফিরে আসুক। তারা শান্তির বিনিময়ে যে কোনো জিনিস গ্রহণ করতে এবং মেনে নিতে রাজি। রাস্তাঘাট, বিপণিবিতানসহ গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের নীরব হতাশা, হৃদয় নিংড়ানো ক্ষোভ ও ঘৃণা। তারা কোনো একক ব্যক্তি বা দলকে ঘৃণা করছে না – তারা সব অকর্মণ্য ও অপদার্থ রাজনীতিবিদকে ঘৃণা করছে। ফলে রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো কাজে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা পাচ্ছে না। এ কারণে তারাও ধীরে ধীরে কান্ত, বিধ্বস্ত এবং অধৈর্য হয়ে পড়ছে। প্রশাসন কেমন যেন আলগা হয়ে পড়ছে আর সুশাসন ধীরে ধীরে লোকালয় থেকে তিরোহিত হয়ে নির্বাসনে চলে যাচ্ছে।
জাতীয় জীবনে এমনতর ঘটনা আমাদের জন্য প্রথম হলেও দুনিয়াতে বহুবার বহু দেশে এই ক্রান্তিকাল আঘাত হেনেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী কর্তৃক ফ্রান্সের নরম্যান্ডি দখলের পর জেনারেল দ্য গল ইংল্যান্ড পালিয়ে যান। ওই সময়টায় ইংল্যান্ডসহ পুরো ইউরোপ ও ইংল্যান্ডের কলোনিগুলোয় মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এই সময়ে জনসম্মুখে এসে বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত আহাদিত হওয়ার কারণে হিটলারও পাবলিক মিটিংয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ করে দেন। তার পক্ষে সব বক্তব্য দিতেন প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস। এখন প্রশ্ন হলো কেন চার্চিল ওই সময়টাতে জনসম্মুখে আসা বন্ধ করেছিলেন। উত্তর একটাই – তিনি তার হতাশাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কোনোদিন নিজেকে সুপারম্যান ভাবেননি। কাজেই তার সময়ের সব উদ্ভূত সমস্যাকে পায়ের নিচে রেখে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় উপস্থাপন করার মতো মনোবল তিনি দেখাতে পারেননি। এমনকি উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনও একই কর্ম করেছেন। অন্যদিকে গাদ্দাফি অতিরিক্ত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন।
বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যত কম সভা-সমাবেশে যাবেন এবং বক্তৃতা-বিবৃতি কম দেবেন ততই তার জন্য মঙ্গল। তার চেহারা-সুরত এবং কথাবার্তায় স্পষ্টতই বর্তমান সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি লক্ষ করেছি যে, তিনি কথা বলতে বলতে বেখেয়ালি হয়ে পড়ছেন এবং এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন। প্রায়ই তার কণ্ঠ কাঁপছে এবং তিনি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন। তার সিনিয়র সহকর্মীদের সবার অবস্থা প্রায় সমান, একমাত্র তথ্যমন্ত্রী ইনু সাহেব ছাড়া। প্রধানমন্ত্রীর কান্না যে তার শুভার্থীদের কতটা কষ্ট দেয় এবং বিরোধীদের আনন্দ প্রদান করে তা যদি তিনি এবং তার চারপাশের লোকজন বুঝতেন তাহলে এই সময়ে কথা কম বলে কাজ বেশি করতেন। বাক্যযুদ্ধ হয় শান্তির সময়। অশান্তির সময় গদ্য থেরাপির বিকল্প নেই।
এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসি। সরকারি দল বলছে তারা গণতন্ত্র, সংবিধান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দল বলছে – ক্ষমতাসীনরা সবকিছু নষ্ট করে ফেলেছে। আমরা ওগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। উভয় দলের উপর্যুপরি কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে দেশের পুরো রাজনৈতিক অঙ্গন ঘোলা হয়ে গেছে। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জের খাল-বিলে আশ্বিন-কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ মাসে মাছ ধরার জন্য শিকারিরা প্রথমেই পানি ঘোলা করে দেয়। পানির সঙ্গে কাদার মিশ্রণের ফলে মাছেরা যেমন পর্যাপ্ত অক্সিজেন লাভ করতে পারে না, তেমনি দেখতে পারে না কোনো কিছু। ফলে তারা তাদের ক্ষেত্র থেকে বের হয়ে অন্ধ অবস্থায় ভাসতে থাকে। আর শিকারিরা তখনি পথহারা, বিভ্রান্ত এবং ভাসমান মাছগুলোকে ফটাফট ধরে ফেলে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চর্চাক্ষেত্র আজ ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ঘোলাটে সময় পার করছে। গণতন্ত্র নামক পুণ্যভূমির নায়ক-মহানায়করা আজ পথহারা। তারা কেউ বলতে পারবেন না তাদের কালকের পরিণতি সম্পর্কে। সবাই প্রচ- হতাশা এবং অবিশ্বাস নিয়ে নিজেদের বিজয় কামনা করছেন আস্থাহীন মন নিয়ে। তাদের এই আস্থাহীনতার মূল কারণ হলো তারা সময়ের কাজটি সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে করতে পারেননি। অনেকগুলো অনৈতিক কর্মের দায় তারা মাথায় করে বেড়াচ্ছেন। কোনো অনৈতিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে কোনোদিন কোনো বিজয়গাথা রচিত হয়নি। ফলে আমাদের সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা খুব ভালো করেই জানেন, তারা কী কী শুভকর্ম করেছেন এবং কী কী অশুভ কর্ম করেছেন। আর এই বোধশক্তির কারণে তাদের আস্থার জায়গাটি একেবারেই নড়বড়ে। সামান্য কম্পনে তারাও কম্পিত হন সমানতালে।
বর্তমান অচলাবস্থা দূর করার জন্য দরকার সত্য বলার এবং সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করার দুরন্ত সাহস। ভুল মানুষরা করে কিন্তু ভুল স্বীকার করে মহামানবরা, অন্যদিকে ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে ভুলের সপক্ষে যুক্তি-তর্ক খোঁজে শয়তান। আল্লাহ যখন ইবলিসকে বললেন – আদমকে সিজদা করো তখন সে আল্লাহর আদেশকে এড়ানোর জন্য টালবাহানামূলক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করল। অন্যদিকে হজরত আদম (আ.) যখন ভুল করলেন এবং আল্লাহ কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হলেন তখন কোনো সাফাই না গেয়ে তিনি সরাসরি আত্মসমর্পণ করে বললেন – হে আল্লাহ! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। এখন তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো তবে আমি তো ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। হজরত আদম (আ.)-এর বংশধর হিসেবে আমাদের জন্য এই মুহূর্তের ফরজ হলো সশব্দে সত্য উচ্চারণ করা। সরকারি দলের কোটি কোটি সমর্থককে বলতে হবে – “সংবিধানের ১৫তম সংশোধনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি দ্ব্যর্থবোধক রায় নিয়ে তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করে বিরোধী দলকে রাজপথে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের মতো একটি গণতান্ত্রিক দলের কোনো মতে এবং কোনো অবস্থাতেই উচিত হয়নি ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের নির্বাচনটি আয়োজন করার। একটি অনৈতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত সফলতাকে দীর্ঘ এক বছর ছলে-বলে-কৌশলে এগিয়ে নেওয়া রীতিমতো গুনাহের কাজ হয়েছে”| দলের ভেতর থেকে যদি সত্যের সপক্ষে আওয়াজ না ওঠে তাহলে অসত্যের দায়ে যদি খারাপ কিছু ঘটে তখন সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ এই দলটির নেতাকর্মীরা দুনিয়া ও আখেরাতে পাবেন না।
গণতন্ত্র মানেই হলো জনগণের ইচ্ছা। জনগণ যখন চাইবে এবং যেভাবে চাইবে, সেভাবেই নির্বাচন হবে। উন্নত বিশ্বে পার্লামেন্ট গঠন করার এক মাসের মধ্যে তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এমন উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা যদি বলেন যে, আমরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছিÑ তাই ৫ বছরের একদিন আগেও যাব না, এ ধরনের কথার মধ্যে কোনো ভদ্রতা নেই। সামন্ততান্ত্রিক প্রথায় রাজা অস্ত্রের জোরে জনগণের ওপর প্রভুত্ব লাভ করে। তাই নেতৃত্ব লাভের জন্য তাকে জনসমর্থন দরকার পড়ে না। কিন্তু নেতৃত্ব লাভের পর রাজাকে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে এবং তা সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য ব্যাপক জনসমর্থন দরকার। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা হতে হলে প্রথমত জনগণের ম্যান্ডেট দরকার এবং নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিটি দিন তাকে গণসমর্থন, আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলতে হয়। চলতি পথের কোনো এক সময়ে জনগণ যদি আওয়াজ তোলে – তুমি সরে যাও তবে ভদ্রলোকরা এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসন ক্ষমতা, সরকার এবং সংবিধানের বেশিরভাগ ধারা-উপধারা অনেকটা গৃহস্থ বাড়ির গৃহকর্তা এবং একজন পথচারী মেহমানের মতো। গৃহকর্তা দাওয়াত করে মেহমানকে বাড়িতে এনেছেন বটে কিন্তু যে কোনো সময় তিনি তার অতিথিকে বলতে পারেন – চলে যান। তখন যদি মেহমান বলেন – যাব না! আপনি আমাকে দাওয়াত করে আনলেন কেন? আপনি গৃহস্থ এবং মেহমানের কথা শুনে ইচ্ছে হলে হাসতেও পারেন – আবার নাও পারেন কিন্তু ঢাকার ঘোড়াগুলো কিন্তু ঠিকই খিলখিলিয়ে হেসে গড়াগড়ি খাবে।
N11
সাবেক সাংসদ ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট
আজকের লেখাটি শুরু করব ঠিক এমন সময়ে আমার এক ভগ্নিপতি ফোন দিলেন। দুলাভাইয়ের বয়স প্রায় ৭৫ বছর। বহু বছর দেশের কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করার পর তিনি বুড়ো বয়সে আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন অবসর সময় কাটানোর জন্য। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে সুনাম থাকার কারণে দেশের একটি শীর্ষ সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। সারা জীবন সোজাপথে চলা বুড়ো মানুষটি বর্তমান জমানার ডিজিটাল ভূতদের সঙ্গে কিছুতেই পেরে ওঠেননি। ফলে একরাশ বেদনা এবং অনেক অমীমাংসিত অভিযোগের দায় মাথায় নিয়ে স্বেচ্ছায় সরে গিয়েছিলেন। তিনি এখন কার্যত বেকার – সারাদিন পত্রপত্রিকা ও দেশি-বিদেশি টিভির খবর দেখেন এবং নীরবে-নিভৃতে সরকার ও সরকারপ্রধানের জন্য উৎকণ্ঠিত থেকে সময় অতিবাহিত করেন।
দুলাভাই হঠাৎ টেলিফোন করে বললেন – রনি তাড়াতাড়ি টিভি খোলো। প্রধানমন্ত্রী কি একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছেন! তিনি আবেগজড়িত হয়ে কেবল চোখের জল ফেলছেন কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। আমি তো আগা-মাথা কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি একটু দেখো এবং কিছু বুঝতে পারো কি না তা জানাও। আমি তাকে বললাম – ভাইয়া আমি তো অফিসে। এখানে ডিশ নেই। তিনি খানিকটা বেদনাহত হয়ে ফোন রেখে দিলেন। দুলাভাইয়ের কথা শোনার পর আমার মনে হলো আজকের শিরোনামে বিস্তারিত লেখার আগে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে কিছু লেখা দরকার।
পুরো দেশ আজ এক জীবন্ত নরককু-লীতে পরিণত হয়েছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষ আজ বিভ্রান্ত, ভীতসন্ত্রস্ত এবং বিক্ষুব্ধ। সরকার সমর্থকরা সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধীদের নির্মূলের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের বারোটা বাজানোর জন্য বিরোধীরা সাধ্যমতো সবকিছু করছে। মাঝখানে জনগণ পিষ্ট হয়ে দৈনিক আড়াই হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন কোনো দলকেই সমর্থন করছে না – বরং উভয় দলকেই ঘৃণা করছে। এমনকি দুই দলের কট্টর সমর্থকরাও চাচ্ছে দেশে শান্তি ফিরে আসুক। তারা শান্তির বিনিময়ে যে কোনো জিনিস গ্রহণ করতে এবং মেনে নিতে রাজি। রাস্তাঘাট, বিপণিবিতানসহ গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের নীরব হতাশা, হৃদয় নিংড়ানো ক্ষোভ ও ঘৃণা। তারা কোনো একক ব্যক্তি বা দলকে ঘৃণা করছে না – তারা সব অকর্মণ্য ও অপদার্থ রাজনীতিবিদকে ঘৃণা করছে। ফলে রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো কাজে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা পাচ্ছে না। এ কারণে তারাও ধীরে ধীরে কান্ত, বিধ্বস্ত এবং অধৈর্য হয়ে পড়ছে। প্রশাসন কেমন যেন আলগা হয়ে পড়ছে আর সুশাসন ধীরে ধীরে লোকালয় থেকে তিরোহিত হয়ে নির্বাসনে চলে যাচ্ছে।
জাতীয় জীবনে এমনতর ঘটনা আমাদের জন্য প্রথম হলেও দুনিয়াতে বহুবার বহু দেশে এই ক্রান্তিকাল আঘাত হেনেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী কর্তৃক ফ্রান্সের নরম্যান্ডি দখলের পর জেনারেল দ্য গল ইংল্যান্ড পালিয়ে যান। ওই সময়টায় ইংল্যান্ডসহ পুরো ইউরোপ ও ইংল্যান্ডের কলোনিগুলোয় মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এই সময়ে জনসম্মুখে এসে বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত আহাদিত হওয়ার কারণে হিটলারও পাবলিক মিটিংয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ করে দেন। তার পক্ষে সব বক্তব্য দিতেন প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস। এখন প্রশ্ন হলো কেন চার্চিল ওই সময়টাতে জনসম্মুখে আসা বন্ধ করেছিলেন। উত্তর একটাই – তিনি তার হতাশাকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কোনোদিন নিজেকে সুপারম্যান ভাবেননি। কাজেই তার সময়ের সব উদ্ভূত সমস্যাকে পায়ের নিচে রেখে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় উপস্থাপন করার মতো মনোবল তিনি দেখাতে পারেননি। এমনকি উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনও একই কর্ম করেছেন। অন্যদিকে গাদ্দাফি অতিরিক্ত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন।
বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যত কম সভা-সমাবেশে যাবেন এবং বক্তৃতা-বিবৃতি কম দেবেন ততই তার জন্য মঙ্গল। তার চেহারা-সুরত এবং কথাবার্তায় স্পষ্টতই বর্তমান সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি লক্ষ করেছি যে, তিনি কথা বলতে বলতে বেখেয়ালি হয়ে পড়ছেন এবং এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন। প্রায়ই তার কণ্ঠ কাঁপছে এবং তিনি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন। তার সিনিয়র সহকর্মীদের সবার অবস্থা প্রায় সমান, একমাত্র তথ্যমন্ত্রী ইনু সাহেব ছাড়া। প্রধানমন্ত্রীর কান্না যে তার শুভার্থীদের কতটা কষ্ট দেয় এবং বিরোধীদের আনন্দ প্রদান করে তা যদি তিনি এবং তার চারপাশের লোকজন বুঝতেন তাহলে এই সময়ে কথা কম বলে কাজ বেশি করতেন। বাক্যযুদ্ধ হয় শান্তির সময়। অশান্তির সময় গদ্য থেরাপির বিকল্প নেই।
এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে আসি। সরকারি দল বলছে তারা গণতন্ত্র, সংবিধান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দল বলছে – ক্ষমতাসীনরা সবকিছু নষ্ট করে ফেলেছে। আমরা ওগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি। উভয় দলের উপর্যুপরি কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে দেশের পুরো রাজনৈতিক অঙ্গন ঘোলা হয়ে গেছে। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জের খাল-বিলে আশ্বিন-কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ মাসে মাছ ধরার জন্য শিকারিরা প্রথমেই পানি ঘোলা করে দেয়। পানির সঙ্গে কাদার মিশ্রণের ফলে মাছেরা যেমন পর্যাপ্ত অক্সিজেন লাভ করতে পারে না, তেমনি দেখতে পারে না কোনো কিছু। ফলে তারা তাদের ক্ষেত্র থেকে বের হয়ে অন্ধ অবস্থায় ভাসতে থাকে। আর শিকারিরা তখনি পথহারা, বিভ্রান্ত এবং ভাসমান মাছগুলোকে ফটাফট ধরে ফেলে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চর্চাক্ষেত্র আজ ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ঘোলাটে সময় পার করছে। গণতন্ত্র নামক পুণ্যভূমির নায়ক-মহানায়করা আজ পথহারা। তারা কেউ বলতে পারবেন না তাদের কালকের পরিণতি সম্পর্কে। সবাই প্রচ- হতাশা এবং অবিশ্বাস নিয়ে নিজেদের বিজয় কামনা করছেন আস্থাহীন মন নিয়ে। তাদের এই আস্থাহীনতার মূল কারণ হলো তারা সময়ের কাজটি সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে করতে পারেননি। অনেকগুলো অনৈতিক কর্মের দায় তারা মাথায় করে বেড়াচ্ছেন। কোনো অনৈতিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে কোনোদিন কোনো বিজয়গাথা রচিত হয়নি। ফলে আমাদের সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা খুব ভালো করেই জানেন, তারা কী কী শুভকর্ম করেছেন এবং কী কী অশুভ কর্ম করেছেন। আর এই বোধশক্তির কারণে তাদের আস্থার জায়গাটি একেবারেই নড়বড়ে। সামান্য কম্পনে তারাও কম্পিত হন সমানতালে।
বর্তমান অচলাবস্থা দূর করার জন্য দরকার সত্য বলার এবং সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করার দুরন্ত সাহস। ভুল মানুষরা করে কিন্তু ভুল স্বীকার করে মহামানবরা, অন্যদিকে ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে ভুলের সপক্ষে যুক্তি-তর্ক খোঁজে শয়তান। আল্লাহ যখন ইবলিসকে বললেন – আদমকে সিজদা করো তখন সে আল্লাহর আদেশকে এড়ানোর জন্য টালবাহানামূলক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করল। অন্যদিকে হজরত আদম (আ.) যখন ভুল করলেন এবং আল্লাহ কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হলেন তখন কোনো সাফাই না গেয়ে তিনি সরাসরি আত্মসমর্পণ করে বললেন – হে আল্লাহ! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। এখন তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো তবে আমি তো ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। হজরত আদম (আ.)-এর বংশধর হিসেবে আমাদের জন্য এই মুহূর্তের ফরজ হলো সশব্দে সত্য উচ্চারণ করা। সরকারি দলের কোটি কোটি সমর্থককে বলতে হবে – “সংবিধানের ১৫তম সংশোধনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি দ্ব্যর্থবোধক রায় নিয়ে তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করে বিরোধী দলকে রাজপথে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের মতো একটি গণতান্ত্রিক দলের কোনো মতে এবং কোনো অবস্থাতেই উচিত হয়নি ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের নির্বাচনটি আয়োজন করার। একটি অনৈতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত সফলতাকে দীর্ঘ এক বছর ছলে-বলে-কৌশলে এগিয়ে নেওয়া রীতিমতো গুনাহের কাজ হয়েছে”| দলের ভেতর থেকে যদি সত্যের সপক্ষে আওয়াজ না ওঠে তাহলে অসত্যের দায়ে যদি খারাপ কিছু ঘটে তখন সেই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ এই দলটির নেতাকর্মীরা দুনিয়া ও আখেরাতে পাবেন না।
গণতন্ত্র মানেই হলো জনগণের ইচ্ছা। জনগণ যখন চাইবে এবং যেভাবে চাইবে, সেভাবেই নির্বাচন হবে। উন্নত বিশ্বে পার্লামেন্ট গঠন করার এক মাসের মধ্যে তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এমন উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা যদি বলেন যে, আমরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছিÑ তাই ৫ বছরের একদিন আগেও যাব না, এ ধরনের কথার মধ্যে কোনো ভদ্রতা নেই। সামন্ততান্ত্রিক প্রথায় রাজা অস্ত্রের জোরে জনগণের ওপর প্রভুত্ব লাভ করে। তাই নেতৃত্ব লাভের জন্য তাকে জনসমর্থন দরকার পড়ে না। কিন্তু নেতৃত্ব লাভের পর রাজাকে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে এবং তা সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য ব্যাপক জনসমর্থন দরকার। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা হতে হলে প্রথমত জনগণের ম্যান্ডেট দরকার এবং নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিটি দিন তাকে গণসমর্থন, আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলতে হয়। চলতি পথের কোনো এক সময়ে জনগণ যদি আওয়াজ তোলে – তুমি সরে যাও তবে ভদ্রলোকরা এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসন ক্ষমতা, সরকার এবং সংবিধানের বেশিরভাগ ধারা-উপধারা অনেকটা গৃহস্থ বাড়ির গৃহকর্তা এবং একজন পথচারী মেহমানের মতো। গৃহকর্তা দাওয়াত করে মেহমানকে বাড়িতে এনেছেন বটে কিন্তু যে কোনো সময় তিনি তার অতিথিকে বলতে পারেন – চলে যান। তখন যদি মেহমান বলেন – যাব না! আপনি আমাকে দাওয়াত করে আনলেন কেন? আপনি গৃহস্থ এবং মেহমানের কথা শুনে ইচ্ছে হলে হাসতেও পারেন – আবার নাও পারেন কিন্তু ঢাকার ঘোড়াগুলো কিন্তু ঠিকই খিলখিলিয়ে হেসে গড়াগড়ি খাবে।
N11


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন